হাওজা নিউজ এজেন্সি: আহলে বাইতের মর্যাদাশীল এই মহীয়সী নারী হযরত ফাতি মা মাসুমা (সা.আ.) সম্পর্কে লিখতে বা বলতে এমন শব্দের প্রয়োজন, যা শুধু চিন্তা থেকে নয়, হৃদয়ের গভীরতা থেকে উৎসারিত হয়। এটি এমন এক ইতিহাস, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোমের মাটির স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। আজও সেই মাটি ধারণ করে আছে সেই মহীয়সী নারীর আগমনের স্মৃতি, যাঁর পদস্পর্শ একটি নগরের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎকে বদলে দিয়েছিল।
মরুভূমির উত্তপ্ত বাতাস পালকির পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছিল। কাফেলার লোকেরা হাত দিয়ে সেগুলো শক্ত করে ধরে রাখছিলেন। কোমের কাছাকাছি মরুপ্রান্তরে তখন কেবল একটি সাধারণ সফর চলছিল না; বরং মনে হচ্ছিল, এই নগরের মাটি যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই মহীয়সী নারীর পদস্পর্শের অপেক্ষায় ছিল এবং তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিল।

হযরত মাসুমা (সা.) সেই পালকিতে কেবল একজন অসুস্থ মুসাফির ছিলেন না; তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন মদিনার গভীর আকুলতা, তাঁর ভাইয়ের বেদনা ও নিঃসঙ্গতা এবং ফাতেমি পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার অমূল্য উত্তরাধিকার।
উটের কাফেলা যখন কোম নগরের প্রবেশপথের কাছে পৌঁছাল, তখন যেন শহরের পরিবেশও বদলে গেল। মদিনার সেই ‘চাঁদ’-এর আগমনের সংবাদ পাওয়া আলে সাদের লোকেরা উৎকণ্ঠা ও অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন।
তবে এই ঐতিহাসিক সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল ‘বাইতুন নূর’-এর নির্জন প্রাঙ্গণে। যখন এই মহান নারী পালকি থেকে নামলেন এবং তাঁর দৃষ্টি পড়ল কোমের সেই মাটির ওপর—যে মাটি সম্পর্কে তাঁর পিতা, হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আগেই সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং যা এখন ইমামতি পরিবারের এক কন্যার আশ্রয়স্থল হতে চলেছে—তখন মুহূর্তটি যেন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
মনে হচ্ছিল, এই মহীয়সী নারী তাঁর ক্লান্ত শরীরে শুধু সফরের কষ্টই বহন করছেন না; বরং অনুভব করছেন রিসালাতের উত্তরাধিকার এবং ইমামতের সত্য ও আদর্শ সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব।

তিনি এই নগরে শুধু একটি শান্তিপূর্ণ ঘরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য আসেননি; বরং এমন এক পবিত্র কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করতে এসেছিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত অসহায় ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে থাকবে।
যেদিন কোমবাসী এই মহীয়সী নারীর মর্যাদা ও মহিমার সাক্ষী হয়েছিল, সেদিন হয়তো তারা উপলব্ধি করতে পারেনি—তাদের মাঝে কী অমূল্য রত্ন এসে উপস্থিত হয়েছে।
তিনি এমন এক মহীয়সী নারী ছিলেন, যিনি অসুস্থতার তীব্র কষ্টের মধ্যেও কোমের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন—সেই আকাশ, যা ভবিষ্যতে আহলে বাইতের অনুসারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার আশ্রয় হয়ে উঠবে।
সেই মুহূর্তে তিনি কেবল হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.)-এর কন্যা ছিলেন না; বরং যুগে যুগে আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে তাঁর দরবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে আসা পথহারা ও আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাতৃসুলভ আশ্রয়ের প্রতীক।
হযরত মাসুমা (সা.)-এর আগমনের পর কোমও একটি সাধারণ নগরীর পরিচয় ছাড়িয়ে ঈমান, জ্ঞান ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।
হযরত মাসুমা (সা.): যাঁর শাফাআত সকল শিয়ার জন্য
কোমের হাওজা ইলমিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষক হযরত ফাতেমা মাসুমা (সা.)-এর মর্যাদা ও অবস্থান ব্যাখ্যা করে তাঁকে আহলে বাইতের সকল ভক্তের জন্য ব্যাপক কল্যাণ ও অনুগ্রহের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ মাহদি মিরবাকেরি বলেন, হযরত মাসুমা (সা.)-এর শাফাআত কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ নয়। বর্ণিত রেওয়ায়েতে এসেছে, তাঁর শাফাআতের মাধ্যমে সকল শিয়া জান্নাতে প্রবেশ করবে। এটি আল্লাহ তায়ালা এই মহান নারীকে যে উচ্চ মর্যাদা ও শাফাআতের অধিকার প্রদান করেছেন, তারই নিদর্শন।
তিনি আরও বলেন, হযরত মাসুমা (সা.) আহলে বাইতের সকল ভক্তের জন্য ব্যাপক কল্যাণের মাধ্যম। তাঁর ব্যক্তিত্বকে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.)-এর ব্যক্তিত্বের একটি প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, হযরত মাসুমা (সা.)-এর জিয়ারতনামা একজন নিষ্পাপ ইমাম (আ.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এটি তাঁর উচ্চ মর্যাদা, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। একজন জিয়ারতকারী মূলত কোনো সাধারণ ব্যক্তিত্বের জিয়ারতে যান না; বরং তিনি সেই বেলায়াতের এক বাস্তব প্রকাশের জিয়ারতে যান, যা এই মহান নারীর অস্তিত্বে প্রতিফলিত হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ মিরবাকেরি হযরত মাসুমা (সা.)-এর কোমে অবস্থান এবং যুগের ইমামের আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুতির মধ্যে গভীর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই মহান নারীর কোমে অবস্থানের ফলে নগরটি আহলে বাইতের পবিত্র হারাম এবং বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞান প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এটি এমন এক জ্ঞানভিত্তিক ও আধ্যাত্মিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে, যা হযরত ওয়ালিয়ে আসর (আ.)-এর বৈশ্বিক বিপ্লবের জন্য চিন্তাগত ও জ্ঞানগত প্রস্তুতির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, হযরত মাসুমা (সা.)-এর জিয়ারতে যাওয়া ব্যক্তির উপলব্ধি করা উচিত যে, তিনি এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের জিয়ারতে যাচ্ছেন, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর ওলিদের পরিচয় ও মারেফাত অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয়। তাঁর জিয়ারত কেবল একটি বাহ্যিক সফর নয়; বরং এটি মানুষের অন্তরে তাওহিদি মারেফাতের দ্বার উন্মোচনের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা।
আপনার কমেন্ট